আর খেলা দেখি না


ছোট বেলার একটা স্মৃতি আমার এখনও মনে আছে । তখন যশোরে থাকি । সম্ভত সময়টা ছিল দুপুরের পরে কিংবা বিকেল বেলা। বাংলাদেশের খেলা চলছে, ফাইনাল খেলা । কিন্তু সেটা টিভিতে দেখানো হচ্ছে না । আমাদের ক্যাসেট প্লেয়ারের রেডিও চালু করে দেওয়া । সেখান থেকে ধারা ভাষ্য শুনছি। আর মাত্র কয়েকরান দরকার  ! এক সময়ে এমন আসলো যে এক বলে এক রান দরকার !

সেই সময়ে ক্রিকেটের এতো মাইর প্যাচ বুঝতাম না । কেবল পাড়ার মাঠে যখন খেলতাম তখন বুঝতাম যে ব্যাট দিয়ে বল বাড়ি মেরে দৌড়ে এই পাশে আসতে পারলে এক রান হয়। সেই একরান দরকার । এক বলে এক রান ! সেই সময়ে উপরওয়ালার উপরে খুব বেশি বিশ্বাস ছিল । আমি আর আমাদের বাড়িওয়ালা ছেলে, আমরা দুইজন সম বয়সী ছিলাম, দুইজন আমরা উপরওয়ালার কাছে মোনাজাত ধরলাম । একটা রান চাই ই চাই । রেডিওতে ধারা ভাষ্যকার কী বলে চিৎকার  করেছিলেন সেটা আজকে মনে নেই তবে এটা মনে আছে যে চারিদিকে এক হর্ষধ্বনি জেগে উঠেছিল। সেই কী তীব্র আনন্দ । নিজের দেশের জয়ে যে এতো তীব্র আনন্দ হতে পারে সেই ছোট বেলায় প্রথমবারের মত আমার উপলব্ধি হয়েছিল । 

আমরা সবাই বাইরে বের হয়ে এলাম । ছোট বড় সবাই । তারপর সেই আনন্দ মিছিল । রং মাখানো । সেদিন গায়ে মুখে শার্টে রঙ দেওয়া নিয়ে কারো কোন অভিযোগ ছিল না । বাংলাদেশ চ্যাম্পিয়ন হয়েছে । আমরা জিতে গেছি। 

তারপর বাংলাদেশের প্রথম বিশ্বকাপ ছিল ৯৯ সালে । সেই সময়ে পাকিস্তান খুব শক্তিশালী দল । সেই দলকে বাংলাদেশ হারিয়ে দিল । আফ্রিদি তখন ভয়ংকর মারকুটে ব্যাটসম্যান । আমাদের গতিদানব সুজন বল করতে গেল ওপেনিং । আফ্রিদি লেগ সাইডে বল পেটাতে গেলে সেটা ব্যাটের এক পাশে গেলে অফ সাইটে ক্যাচ উঠে গেল । আফ্রিদি আউট ! সেই সময়ে খালেদ মাহমুদ সুজনের সেই মুখভঙ্গি আমার এখনও চোখের সামনে ভাসে ! 

তারপর অবশ্য সেই উত্তেজনা আর থাকে নি । আমি কোন কালেই ঠিক খেলা ভক্ত না । ক্রিকেট খেলার এতো লম্বা সময় নিয়ে দেখা আমার কাছে অযথা মনে হত । কিন্তু যখনই বাংলাদেশের খেলা হত, তখন ঘুরে ফিরে যে কোন ভাবে স্কোর জানার একটা চেষ্টা করতাম । আগে তো এভাবে নেট ছিল না । আমার একটা ছোট রেডিও ছিল । সেই রেডিওতে স্কোর জানাত সেটা জানার চেষ্টা করতাম সব সময় । অন্য দেশের খেলার খোজ আমি কোন দিন রাখিও নাই । কিন্তু নিজের দেশের খেলা বলে কথা ! এরপর টিভিতে নিয়মিত খেলা দেখানো শুরু হল সরাসরি । ডিস লাইন সব স্থানে চলে এল । তখন খেলার সময়ে চায়ের দোকানে লোকজনের ভীড় লেগে থাকত । আমি বাইরে বের হলে এক পলক উকি দিয়ে স্কোর জানার চেষ্টা করতাম । এরপর যখন যখন নেট হাতে চলে এল তখন এই স্কোর জানতে আর অন্য কিছুর উপর নির্ভর করতে হত না । নিজেই সব সময় জানতে পারতাম । 

বাসায় থাকলে টিভিতে নেটে খেলা বাংলাদেশের খেলা দেখার চেষ্টা করতাম সব সময়। আমি কখনও অন্য দেশের খেলা এক জায়গা বসে দেখেছি বলে আমার মনে পড়ে না । তবে নিজের দেশের খেলা অনেকবারই দেখেছি সব কিছু বাদ দিয়ে। কিন্তু যতবার খেলা দেখতাম, আমাকে বেশির ভাগ সময়ে হতাশই হতে হত কেবল ! শুধু হতাশ । 

একবার এশিয়া কাপে বাংলাদেশ অল্পের জন্য হেরে গেল । সেদিন মনের ভেতরে কী তীব্র আক্ষেপ যে জন্মেছিল সেটা লিখে কোন দিন বোঝানো যাবে না । কিন্তু একটা সময়ে দেখা গেল যে যে আমার মনে আর কোন আক্ষেপ জমছে না । খেলাতে হারজিত থাকবে এইটা স্বাভাবিক । কিন্তু একটা সময় খেয়াল করলেন যে আমাদের দেশের প্লেয়াররা কোন চেষ্টাই করছেন না । মাঠে তাদের একটা গাছাড়া ভাব । নিজেদের উন্নত করার কোন প্রয়াস তাদের মাঝে নেই। কোন জবাবদিহিতা নেই কিছু নেই। এই দিনের পরে দিন ম্যাচ হেরেই চলেছে। একটা সময়ে এই দলের উপরে এতোটাই বিতৃষ্ণা জন্মালো যে আর খেলা দেখা আমি বাদ দিলাম । এখন এই দলের খেলা আমি আর দেখি না । আগের বলেছি খেলা দেখার প্রতি আমার খুব একটা আগ্রহ কোন কালেই ছিল না । নিজের দেশের খেলা বলেই এক সময়ে একটা আগ্রহ ছিল । তবে এখন আর সেটা একদম চলে গেছে ।







Comments